মেয়েদের বুকের ব্যায়াম

ছবি: সংগৃহীত।

সুন্দর বুক ছাড়া সুন্দর শরীর পাওয়া যায় না এটা জানা কথা। আর এটাও জানা যে সুন্দর বুকের জন্য আপনাকে ঠিকঠাক ব্যায়াম করতে হবে। তবে শুধু সুন্দর হওয়ার জন্যেই বুকের দিকে নজর দেবেন তা কিন্তু না। সুস্থ ও ফিট থাকার স্বার্থেও এটা খুব জরুরী। প্রথমেই ঝালিয়ে নেওয়া যাক আমাদের বুকের গড়ন ঠিক করতে ব্যায়ামের ভুমিকা।

মেয়েদের প্রধান চাহিদা একটা সুগঠিত দৃঢ় স্তন, যা অন্যের নজর টানবে আর পুরুষকে আকৃষ্ট করবে। কারণ অনেক মেয়ের ক্ষেত্রেই দেখা যায় বয়স সেরকম না হলেও স্তন ছোট বা শিথিল হয়ে যাওয়ার সমস্যায় ভুগছেন।

বুকের গঠন : 

আমাদের দেহ অনেক পেশি দিয়ে তৈরি। তাদের মধ্যেই গুরুত্বপূর্ণ একটি পেশি হল পেক্টোরাল মাসল। আমাদের বুক জুড়ে ছড়িয়ে আছে এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পেশি। আমাদের বুকের মাঝখানে যে বড় হাড়টি(স্টার্নাম) আছে তার দুপাশে পাঁজরের উপর দিয়ে হাত ও কাঁধের সংযোগস্থল পর্যন্ত ছড়িয়ে আছে এই পেশি। আমাদের শরীরের সবচেয়ে বড় পেশিগুলির মধ্যে এই পেশিটি পড়ে। এই পেশির সাহায্যে আমরা আমাদের হাত নিচে,ওপরে,পাশে, ভেতরের দিকে নড়াচাড়া করাতে পারি। এই পেশি দুরকমের – ১) পেক্টোরাল মেজর, ২) পেক্টোরাল মাইনর। পেক্টোর‌্যাল মাইনরের অবস্থান পেক্টোরাল মেজর পেশির ঠিক নীচে।

বুকের উপর ছড়িয়ে থাকা এই পেশি ছেলেদের ক্ষেত্রে সরাসরি দেখা যায়। কিন্তু মেয়েদের ক্ষেত্রে এটি স্তনের নিচে ঢাকা থাকে বলে বাইরে থেকে দেখা যায় না। শারীরিক বৈশিষ্ট্যের এই তফাতের জন্য ছেলেদের চেয়ে মেয়েদের বুকে ফ্যাট বা চর্বির পরিমাণ অনেক বেশি থাকে। স্তনে কোন পেশি থাকে না; মূলত ফ্যাট এবং দুধ সৃষ্টি ও সঞ্চয় করার গ্ল্যান্ড দিয়ে এটি তৈরি হয় মেয়েদের শরীরে থাকা এস্ট্রোজেন হরমোনের প্রভাবে।

বুকের ব্যায়ামের উপকারিতাঃ- 

১) বুকের ব্যায়াম পেক্টোরাল পেশিগুলিকে পুষ্ট, দৃঢ়, শক্তিশালী ও নমনীয় করে গড়ে তোলে।

২) বুকের যথাযথ ব্যায়ামের সাহায্যে আমরা আমাদের শরীরকে অনেকরকম চোট আঘাত থেকে রক্ষা করতে পারি।

৩) বুকের পেশির ব্যায়াম শুধু সৌন্দর্য্য বৃদ্ধি করে না, গোটা শরীরকে সচল রাখতে সাহায্য করে। হাত ও কাধেঁর সংযোগস্থল শক্তিশালী করতে সাহায্য করে।

৪) মেয়েদের ক্ষেত্রে বুকের ব্যায়ামের ফলে পেক্টোরাল পেশিগুলি শক্তিশালী হলে স্তনের ঝুলে যাওয়া আটকাতে সাহায্য করে স্তনকে উঁচু ও সুদৃঢ় দেখায়।

যে ছেলেদের বুকের খাঁচা বড় স্বাভাবিক ভাবেই ব্যায়ামের ফলে তাদের বুক অনেক বেশি সুন্দর হবে। যাদের বুকের খাঁচা ছোট বিশেষজ্ঞের মত নিয়ে পুষ্টিকর খাবার খেলে এবং সঠিক ভাবে ব্যায়াম করলে তাদেরও বুকের সৌন্দর্য্য অনেকগুণ বাড়ানো সম্ভব।

মেয়েদের শরীরে অতিরিক্ত চর্বি হলে অন্যান্য জায়গার সঙ্গে স্তনেও তা জমা হয়। ফলে স্তনের সৌন্দর্য্য নষ্ট হয়ে যায়। বুকের পেশির ব্যায়ামের সঙ্গে গোটা শরীরের জন্য কার্ডিও ব্যায়ামকে যুক্ত করলে অতিরিক্ত চর্বি কমে স্তনের আকার সঠিক জায়গায় ফিরবে এবং দেখতেও অনেক আকর্ষণীয় লাগবে। ছেলেদের ক্ষেত্রেও বুকের পেশির ব্যায়ামের সঙ্গে কার্ডিও ব্যায়াম যথা সাইক্লিং, জগিঙ, দৌড়, হাঁটা, সাধারণ ফ্রি হ্যান্ড ব্যায়াম যুক্ত করা দরকার।

মেয়েদের বুকের গঠন ও ব্যায়াম এই নিয়ে অত্যন্ত জরুরি কিছু বিষয়ঃ

মেয়েদের যৌবনলাভের সময়ে এস্ট্রোজেন হরমোনের প্রভাবে স্তন গড়ে ওঠে। অতিরিক্ত এস্ট্রোজেনের (estrogen) প্রভাবে স্তনের আকার অনেক সময় বেশ বড় হয়ে যায় এর ফলে শারীরিক অসুখ, এমনকি ক্যান্সার পর্যন্ত হতে পারে। ব্যায়ামের সাহায্যে এস্ট্রোজেন নিয়ন্ত্রণ করা ছাড়াও বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুযায়ী খাবার খেতে হবে,যার দ্বারা এটা নিয়ন্ত্রণে থাকে। যেমন- সয়াবিন জাতীয় খাবার এড়িয়ে চলতে হবে। একই ভাবে যাদের স্তন অপুষ্ট বা ছোট তারা ব্যায়ামের সঙ্গে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিয়ে খাদ্য তালিকায় এমন খাবার রাখবেন যা এস্ট্রোজেন বাড়াতে সাহায্য করবে।

আমরা চটজলদি ফল পেতে স্তন বড়কে (Big Breast) ছোট করতে ও ছোটকে বড় করতে অপারেশন, হরমোন পিল ইত্যাদি ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নিই। কিন্তু মনে রাখবেন এতে ঝুঁকি আছে এমনকি ক্যান্সারের আশংকা অনেক বেশি। তবে ছেলেরাও কিন্তু অনেক সময়ে চটজলদি মাসল পাওয়ার লোভে নানা ট্যাবলেট খেয়ে থাকেন যার ফল মারাত্মক হতে পারে।

বুকের কয়েকটি ব্যায়াম –

ব্যায়াম শুরুর আগে অবশ্যই একজন ফিটনেস বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন, বিশেষ করে যদি আপনি বাড়িতে ব্যায়াম করেন। না হলে লাভের চেয়ে ক্ষতি হতে পারে।

বুক ঠিকঠাক গড়ে তুলতে ওয়েট ট্রেনিং বা ওজন নিয়ে ব্যায়াম অবশ্যই অনেক বেশি কার্যকরী। তবে কোনদিন সেভাবে ব্যায়াম বা খেলাধুলা না করলে কিছুদিন খালিহাতে ব্যায়াম করে একই ব্যায়াম নানা ওজনের ডাম্বেল নিদেন পক্ষে দুটি সমান ওজনের জলের বোতল নিয়েও করতে পারেন। তবে বুকের বা অন্য যে কোন পেশির ওয়েট ট্রেনিং সপ্তাহে তিন দিনের বেশি করবেন না। কারণ, এই ধরণের ব্যায়ামে পেশির উপর যে চাপ পড়ে বা ক্ষয় হয় তা পূরণ হতে মোটামুটি ৪৮ ঘন্টা সময় লাগে।

এবার আসা যাক নির্দিষ্ট কয়েকটি ব্যায়ামের আলোচনায়:

১/ পুশ আপ: (Push up) বুকের পেশিগুলিকে শক্তিশালী করা বা মেয়েদের ক্ষেত্রে বুকের গড়নকে সুন্দর করার জন্য হোক পুশ আপের জুড়ি নেই। এই বায়ামটি বাংলায় সাধারণভাবে বুক ডন দেওয়া বলে পরিচিত। বেঞ্চ প্রেস, মাল্টি জিম বা অন্যান্য মেশিন ব্যাবহার করে যে ফল আপনি পাবেন নানা ধরণের পুশ আপ তাঁর চেয়ে ভাল ছাড়া খারাপ ফল দেবে না। তবে অনেকের জন্য এটা শুরুতে একটু কঠিন মনে হতে পারে। সেই জন্যে পুশ-আপকে ফুল পুশ- আপ, হাফ পুশ-আপ বা বেঞ্চ পুশ-আপ এরকম কয়েকটি ভাগে ভাগ করে নেওয়া যেতে পারে।

ক) ফুল পুশ-আপ: (Full Push Up) উপুর হয়ে শুয়ে পরুন। পায়ের আঙুলের উপর ও হাতের তালুর উপর ভর দিয়ে শরীর উপরে তুলে ধরুণ। এবার তালুর উপর ভর দিয়ে কনুই ভেঙ্গে শরীরকে একবার উপরে আর একবার নীচে নামিয়ে পুশ আপ করুন। ১০ বার করে ৩টে সেট।

খ)/ হাফ পুশ-আপ: (Half Push Up) হাঁটুর উপর ভর দিয়ে উপুর হয়ে শরীরের উপরের অংশ মেঝের সমান্তরাল রাখুন। গোড়ালি তুলে রাখুন। হাতের উপর ভর দিয়ে শরীরের উপরের অংশ যতয়াট পারেন নামান আব্র তুলুন। মনে রাখবেন গোড়ালি যদি মাটি ছুঁয়ে যায় তাহলে এই ব্যায়ামের পুরো ফল পাবেন না। এটিও এক একবারে ১০টি করে তিন সেট করবেন। যারা ফুল পুশ-আপ পারবেন না তাঁরা এইভাবেও শুরু করতে পারেন।

গ) বেঞ্চ, খাটের বা জানালার ধারে দুটো হাতের ভর রেখে পা দুটো পেছিয়ে শরীরকে কোণাকুণি রাখুন। এবার এখান থেকে পায়ের আঙুল স্থির রেখে হাতের উপর ভর দিয়ে শরীরে উপরের অংশকে নামিয়ে আনুন যতটা নীচে সম্ভব। আবার শরীর কে তুলে নিয়ে আগের জায়গায় ফিরে যান। এই ব্যায়ামটি ও ১০ বার করে তিন সেট করতে পারেন আপনি ফুল পুশ-আপ না করলে।

২/ হাত শরীরের পাশে রাখুন। কাঁধ পর্যন্ত তুলুন আর নামান আগের জায়গায়। ১০ বার করে দুই বা তিন সেট করুন। এই ব্যায়ামটি ডাম্বেল নিয়ে করতে পারেন। আপনার সামর্থ অনুযায়ী কোন ওজনের ডাম্বেল নেবেন ঠিক করুন।

৩/ হাত সামনের দিকে জোড়া করে দাড়াঁন। এবার হাত খুলে কাঁধ পর্যন্ত নিয়ে যান। আবার আগের জায়গায় নিয়ে আসুন। ১০ বার করে ৩টে সেটে এটা করুন। এটা ডাম্বেল নিয়ে বা খালি হাতে করতে পারেন। শুরুতে কিছুদিন খালি হাতে অভ্যাস করে পরে ডাম্বেল নিয়ে করতে পারেন।

৪/ দরজা বা দেওয়ালের উপর দুহাত দিয়ে চাপ রাখুন। পা দুটো জোড়া করে দাঁড়ান। হাতের উপর চাপ রেখে শরীরের সামনের অংশ সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যান। ১০ বার করে এইভাবে ৩ বার।

৫) দেওয়ালের উপর একহাত দিয়ে পাশ ফিরে দাঁড়ান। হাতের উপর চাপ রেখে কোমর থেকে উপরের অংশ দেওয়ালের দিকে নিয়ে যান। এইভাবে এক এক হাতে ১০ বার করে ৩ বার করুন।

৬) সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে হাত সামনে সোজা ভাবে রাখুন। এবার ডান হাত বাঁ দিকে এবং বাঁ হাত ডান দিকে X এর মত করুন। অর্থাৎ বাঁ হাত ডান হাতের একবার উপর দিয়ে, একবার নীচে দিয়ে এইভাবে ১০ বার করুন। এমনভাবে করুন যাতে কনুই বুকের পাশে চেপে আসে।

৭) বেঞ্চের উপর হেলান দিন বা শুয়ে পড়ুন। হাত সামনের দিকে সোজা করুন এবার হাত দুটো কাঁধ বরাবর নিয়ে যান আবার সামনে নিয়ে আনুন এইভাবে ১০টা করুন। ডাম্বেল নিয়ে বা খালি হাতে করতে পারেন।

৮/ বেঞ্চে হেলান দিয়ে বা শুয়ে ডাম্বেল নিয়ে বা খালি হাতে হাত একসঙ্গে বুকের উপর এক নিয়ে আসুন। এবার দুটি হাত পিছন দিকে নিয়ে যান একদম মাথার দু পাশ বরাবর টান টান করে হাত আগের জায়গায় নিয়ে আসুন।

৯/ দরজার ফ্রেমে দু হাতের বুকের উচ্চতায় রাখুন। স্বাভাবিকভাবে দাঁড়ান। এবার হাতের উপর চাপ দিয়ে সামনে এবং নীচের দিকে ঠেলুন। পায়ের পাতার সামনের অংশ আর আঙুলের উপর ভর দিন এবং স্থিরভাবে রাখুন। আবার আগের জায়গায় ফিরে যান। এইভাবে দশবার।

আপাততঃ এর মধ্যে কয়েকটি বেছে নিয়ে শুরু করুন আপনার ঘরে, হোটেলে, খোলা মাঠে, যেখানে যখন আপনার সুবিধা।